Main Menu

প্রতিকার

মো. কামরুল ইসলাম

নয়টা বাজতে এখনো পনের মিনিট বাকি।চেম্বারের সামনে গাড়ি থামতেই দেখি বহু মানুষের ভিড়।হিতে বিপরীত দৃশ্য।এত রোগীর আশা ছিল না।যাক অন্তত ঢাকা থেকে আসা যাওয়ার টাকাটা অন্তত উঠবে।আর অবশ্য টাকার জন্য এইখানে চেম্বার খুলিনি, নিজ থানা শহরে একটু জনপ্রিয়তা বাড়ানো এই আরকি।

গাড়ি থেকে নেমেই অ্যাসিসটেন্ট সবাই বলে দিল স্যার এখন ফ্রেশ হবেন।ঠিক নয়টা থেকেই রোগী দেখা শুরু করবেন।আমি ফ্রেশ হয়ে এসে চেম্বারের তুলতুলে চেয়ারটায় বসলাম।অ্যাসিসটেন্ট বলল

-স্যার, ডাকা শুরু করব?

-হ্যাঁ, এখন ডাকতে পারো।

অ্যাসিসটেন্ট ডাকল

-এ….ক।

প্রথম সিরিয়ালের রোগী আসল।চেকআপ করে ঔষুধ লিখে দিলাম।বেচারা প্রশ্ন করে বসল

-স্যার,ঔষুধ দিবেন না?

আমি বললাম-

-এই যে লিখে দিলাম তো।

-না,মানে স্যার তাহলে ওষুধ কে দিবে?

আমি বুঝতে পারলাম বেচারা ডাক্তার মানে বুঝে ফার্মেসির লোক।আমি তাকে বললাম

-চাচা,কোন এক ফার্মাসি থেকে কিনে নিয়েন।

আবার বেচারা বলে বসল

-তাহলে পাঁচশ টাকা দিলাম যে।

আমি এইবার শিউর তিনি কোনদিন ডাক্তারের কাছেই যাননি, তাকে আবার বললাম

-চাচা,এটা ভিজিটের টাকা।

আমি অ্যাসিসটেন্টকে ডেকে তাকে ভালো করে বুঝিয়ে দিতে বললাম।অ্যাসিসটেন্ট ‘দু….ই’ ডেকে তাকে বুঝিয়ে বাড়ি চলে যেতে বললাম।তবু বেচারা বৃদ্ধ চাচ অসন্তুষ্টির ঢেকুর তোলে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল।

দ্বিতীয় সিরিয়ালের রোগী দেখা শেষ না হতে দেখি একটা পুলিশের গাড়ি এসে থামল চেম্বারের সামনে।আমি রোগী দেখছি আর খেয়াল করছি।দেখি গাড়ি হতে একটা ভূড়িওয়ালা লোক আমার দিকে আসছে।লোক বললে ভুল হবে,পুলিশের ড্রেস গায়ে তার মানে হয়তে পুলিশই হবে। বয়স ৩৭-৩৮ এর দিকে হবে।

অ্যাসিসটেন্ট ডাকল,’তিন’

ততক্ষণে পুলিশ আমার চেম্বারের টেবিলটার সামনে এসে দাঁড়াল, আর বলল ডাক্তার সাহেব আমিই তিন নাম্বার সিরিয়ালের রোগী।আমি সমাদারের সহিত বললাম

-ও আচ্ছা,বসেন বসেন।কেমন আছেন?

প্রশ্ন করে উনার শার্টের দিকে তাকাতেই দেখি লেখা।পুলিশ সুপার বদরুল আলম।আমার চিনতে বাকি রইল না।

তিনি শুকনো মুখে উত্তর দিল

-ভাল কিভাবে থাকি?

-কেন কী হয়েছে স্যার?,আমার আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস

-রাতে আপনার অ্যাসিসটেন্টকে বলেছিলাম সবার আগে সিরিয়াল দিকে,সে দিল কিনা তিন নাম্বারে।

আমি তোষামোদের মুডে উত্তর দিলাম

-সেটা কোনো বিষয় না স্যার!আপনি যখনই আসতেন আমি তো তখনই ট্রিটমেন্ট করতাম।

পুলিশ সাহেব সন্তুষ্ট হয়ে বলল

-হু,সেটাই।

আমি এবার চেম্বার আসার কারণ জিজ্ঞাস করলাম

-স্যার,আপনার সমস্যা কী বলুন? মানে কেন এসেছেন

-সমস্যা কিছুই না

-কিছু না মানে,স্যার?

-না,মানে আমি নাকি দিন দিন আনম্মার্ট হয়ে যাচ্ছি।

-কী বলেন স্যার।কে বলল আপনি আনস্মার্ট হয়ে যাচ্ছেন? আপনি তো এখনো যথেষ্ট স্মার্টই আছেন।

পুলিশ সুপার মনোকষ্ট নিয়ে বলল

-কে আর বলবে?শুধু কি তায়?সে আরো বলে আমি নাকি তার সঙ্গে এখন মানাই না।

আমার আর বুঝার বাকি রইল না যে এইসব তার নিজ স্ত্রীর কথা।ভাবছি উনার স্ত্রীর কথা,এই বয়সেও তিনি স্মার্ট স্বামী চায়।আমি একটু ভেবে বললাম

-আচ্ছা,স্যার আপনাকে গিন্নি আনস্মার্ট ভাবে কেন?

-ভূঁড়ি।আমার ভূঁড়ি নাকি দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে, থামবে না নাকি কখনো।

-ভূঁড়ির জন্যই আপনাকে তিনি আনস্মার্ট ভাবেন।

-হ্যাঁ,আপনি দ্রুত ওষুধ লেখেন।টাকার চিন্তা করবেন না কী কী করতে হবে আপনি শুধু বলেন।

-স্যার বলি কি! ভূঁড়ি কমানোর ট্যাবলেট কিংবা সার্জারি কিংবা ওষুধ এখনো আবিষ্কার হয়নি যে।

পুলিশ সাহেব আমার এই কথা শুনে হতাশা মিশ্রিত জবাব দিল,

-তাহলে কি আমার প্রতিদিন বউয়ের এসব কথা শুনতে হবে?

-স্যার,ভূড়ি কমানোর জন্য আমার নিজের আবিষ্কার করা একটা ট্রিটমেন্ট আছে।

-সেটাই তো আমি চাচ্ছি।আপনি শুধু বলেন।

-আপনি ওষুধটা ফলো করতে পারবেন তো?

-পারবো না মানে?আপনি ওষুধ লিখুন আর বলেন কোথায় পাওয়া যাবে।

-না,মানে স্যার সেটা কোন ওষুধ না!সেটা করলে আপনার কাজ হতে পারে..

-আচ্ছা আপনি সেটাই বলেন?

আমি বুকে হিমালয়ের মত সাহস জমিয়ে বলেই দিলাম

-স্যার, ‘ঘুষ খাওয়া থেকে বিরত থাকুন’ দেখবেন ঠিকই এই রোগ থেকে প্রতিকার পেয়ে যাবেন।

আমি পুলিশ সুপারের দিকে তাকিয়ে রইলাম আর টের পেতে লাগলাম স্যারের মুখ থেকে এখনই একটা বোমা ফাটবে আমার ওপরে।কিন্তু বোমা ফাটার পরিবর্তে বউয়ের ডাকে আমার ঘুম ভেঙে গেল।

বউ বলল-

-এই উঠো তো।এই নিয়ে দশবার ডেকে গেলাম।তোমার না আজ তো (রোগী দেখতে) উপজেলা শহরে যাওয়ার কথা।মাসে একবারই তো।উঠো…

লেখক: কামরুল ইসলাম, শিক্ষার্থী, শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ, জামালপুর






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*