Main Menu

তোমাকে খুঁজবো, যতোক্ষণ এ দেহে প্রাণ আছে

সাইফুল ইসলাম বাবুল ঃ

কী করবো, ভেবে পাচ্ছি না। কী লিখবো, তাও বুঝে উঠতে পারছি না; অথচ মনের ভেতর একটা বড় ঝড়, একটা দ্রোহ, একটা অস্থিরতা সারাক্ষণই আমাকে পিষে মারছে মরিচ-কুটা মেশিনের মতো। একটা কিছু লিখতে হবে আমাকে, নইলে বিবেকের কাছে দায়ী থাকবো। না লিখলে আমার হৃদপিণ্ড বাহির হয়ে যাবে।

দেশের এমন পরিস্থিতিতে মন-মর্জি ভালো যাচ্ছে না। চারপাশে নেতাদের শুধু দুর্নীতি আর লুটপাট। দেশে চোর-ডাকাত আছে সত্য, কিন্তু এরা চুরি-ডাকাতি করে পেটের দায়ে অথবা একটু ভালোভাবে বাঁচার আশায়। আর নেতারা? তারা করে বিত্তবান হওয়ার জন্য এবং বিত্ত-বৈভব আকাশে ঠেকানোর আশায়।  দেশের যতো অশান্তি ওই দুর্নীতির কারণে। সকল মানুষ ভুগছে অশান্তিতে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতারা ছাড়া।

আর আমরা যারা লেখালেখি করি, তাদের ভাবনাটা ভিন্ন ধাঁচের, ভিন্ন মাত্রার, ভিন্ন গন্ধের। জীবনকে যতোটা ভালোবাসি আমরা ঠিক ততোটাই ভালোবাসি এ-দেশকে, এ-দেশের সাধারণ মানুষকে। দেশ হবে শান্তিময়-এটাই আমাদের একমাত্র চাওয়া।

যা হোক কলম যখন ধরেছি, তখন একটা গল্প আপনাদেরকে বলতেই হবে। ঠকানো আমার কাজ নয়। তাই আমার এক বন্ধুর গল্প আজ আপনাদেরকে শোনাবো। সবাই তাকে ডাকতো চোর বলে। শুধু আমি আর আবুল ছাড়া ( ছন্দ নাম)। এতে তার কোনো আপত্তি ছিলো না, বরং সে সত্য-স্বীকৃতির জন্য লোকজনকে ধন্যবাদ জানাতো।

আমরা দুজন মিলে অনেক বোঝানোর চেষ্ট করেছি গ্রামের মানুষদের কিন্তু কোনো কাজ হয় নি। উল্টো আমরা তার সঙ্গ ত্যাগ না করলে আমাদেরকেও চোর বলে আখ্যায়িত করা হবে। যা হোক, আমরা কখনোই তাকে ছাড়ি নি।

এ্যাতো ভালো সম্পর্ক ছিলো আমাদের তিনজনের মাঝে যে, সবাই অবাক হয়ে যেতো। সে লেখাপড়া করতো না। ক্লাস থ্রি  কিংবা ফোর পর্যন্ত বোধ হয় বিদ্যালয়ে গিয়েছিলো। আমরা দুজনে কতো চেষ্ট করেছি কিন্তু তাকে আর বিদ্যালয়মুখী করতে পারি নি। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও চেষ্টা করেছেন, গ্রামের দু’একজন মানুষ যে চেষ্টা করে নি তা নয়। কোন মতেই সে আর বিদ্যালয়ে ফিরলো না। তবুও আমাদের বন্ধুত্বে কখনো ছেদ পড়ে নি। আমার মা-বাবাও তাকে খুব ভালোবাসতেন। ছেলের অধিকার দিয়ে আমাদের বাড়িতে রেখে তাকে বড়ো করতে চেয়েছিলেন, সেটাও হলো না। অদ্ভুত রকমের এক চঞ্চল ছেলে। এই আছে তো এই নেই। কোথায় যাবে, কি করবে তা অন্যরা তো দূরের কথা, সে নিজেও বোধ হয় জানতো না। শুধু বিকেল হলে আমাদের কাছে চলে আসতো।

একসঙ্গে খেলতাম, গল্প করতাম। খাওয়ার সময় হলে আমরা খুব পীড়াপিড়ি করতাম কিন্তু খেতো না। আবার যেদিন ইচ্ছে হতো সোজা এসে বসে পড়তো। আমাদের বাড়ির দুয়ার সব সময় তার জন্য খোলা থাকতো। সে খুব মজার মজার গল্প জানতো, বলতেও পারতো রসালো করে। আমি আর আবুল ( ছদ্মনাম) এক সঙ্গে রাতে ঘুমাতাম। তাকে প্রতিরাতেই আমরা চাইতাম কিন্তু সে আসতো না। আবার ওই যে, ইচ্ছে হলেই চলে আসতো। সেদিন যে কী খুশী হতাম আমরা! খুব মজা করে তার গল্প শুনতাম। এ্যাতো সুন্দর সুন্দর গল্প তুই কোথায় থ্যাকা শিখসো? এমন প্রশ্ন করলে হেসে বলতো আমি বানাই।

তখন আমরা সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। আমরা অবাক হতাম ভেবে, সে লেখাপড়া করে না, অথচ কী মজার সব গল্প বানায়! আর আমরা লেখাপড়া করেও পারি না। ওটা শোনার পর তার প্রতি আমাদের আগ্রহ আর ভালোবাসা আরো বেড়ে গিয়েছিলো। সেও তা অনুধাবন করতে পেরেছিলো। আমি এখন বিস্মিত হই ভেবে যে, ওই অতটুকু বয়সে সে কী করে মানুষের মনে যা চায় তা ধরতে পেরেছিলো!

ততোক্ষণ পর্যন্ত কোনো সৌন্দর্যের প্রতি বেশিরভাগ মানুষ শ্রদ্ধাশীল থাকে যতোক্ষণ সে না জানে যে, তা কোনো অখ্যাত কারো সৃষ্টি। এটা সে ওই বয়সেই ধরে ফেলেছিলো, যা আমরা কতো পরে বুঝেছি! নাম তার জামাল (ছদ্মনাম)। জামের মতোই কালো কুচকুচে গায়ের রঙ। এক ভিন্ন গড়নের কালো বলে সবার নজর কাড়তো। ত্বকটা ছিলো মসৃণ চকচকে! ভেতরটা পাকা টসটসে জামের মতোই ছিলো রসে টইটম্বুর। সে যখন এ ধরায় পা রাখলো ঠিক তখনই তার মা বিদায় নিলো। বাপ চলে গেলো বছর চারেক পরেই ম্যালেরিয়া জ্বরে। ছিলো না কোনো জমিজমা, ছিলো না কোনা টাকা-পয়সা। পরিবারে উপার্জনক্ষম রোগাক্লিষ্ট একমাত্র বৃদ্ধ দাদী দু-মুঠো চাল ভিক্ষা করে এনে তাকে বছর তিনেক এগিয়ে দিয়ে চলে গেলো পরপারে।

যখন সে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলো তখন থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব শুরু। অদ্ভুত ব্যাপার, সে ছোট থেকেই স্বাধীনচেতা, কারো গলগ্রহ সে পছন্দ করতো না। যতোদিন স্কুলে ছিলো, আমাদের বাড়িতে খেয়েছে, থেকেছে। তারপর একদিন স্কুল ছাড়লো, আমাদের বাড়িও। ঠিক সেই সময় থেকেই সে দিনে দিনে চোরের বদনাম নিয়ে বেড়ে উঠতে লাগলো।

কী চুরি করতো শুনবেন? গাছের ফল, ভাত-তরকারি। ফল-মৌসুমে সে ভাত খেতো একবেলা। ফলমূল খেয়েই থাকতো। তার যতোটুকু প্রয়োজন ততোটুকু ভাত-তরকারি চুরি করতো। ধরাও পড়েছে কয়েকবার। চড়-থাপ্পরও খেয়েছে। তবুও ছাড়ে নি। নারকেল  চুরি করতে গিয়ে একবার রাতের বেলা গাছেই ধরা খেলো। মারধরও খেলো। আমরা খুব কষ্ট পেতাম যখন কেউ তার গায়ে হাত তুলতো। আমরা অনেক বুঝিয়েছি, কাজ হয় নি। সে হাসতো আর বলতো, এডা একটা ব্যাপার হলো! তারপর একটু চুপচাপ থেকে বলতো, আমার যতোখানি  প্রয়োজ লাগে ততোখানিই নিই-ফলই হোক আর ভাত-তরকারিই হোক- এটা কি চুরি কয়?আমরা এতোটুকু দেরি না করে বলতাম, চুরি তো কয়! না বইলা  লিলে সেটা চুরি হয়। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলতো, তাহলে তো মাুনষে আমাক ঠিকই চুর কয়।

তখন আমরা দশম শ্রেণির ছাত্র। একদিন এক ঘটনা ঘটে গেলো। গ্রামের এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবার তার নামে চুরির অপবাদ দিলো। তাদের ঘর থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা খোয়া গেছে। টাকাটা জামালই নিয়েছে, তারা সরাসরি বললো। সালিশ বসলো। তাকে ব্যাপক মারধর করা হলো। সে শুধু হাউমাউ করে কাঁদছিলো আর বলছিলো, আমি টাকা চুরি করি নি। একে তো সবাই চোর হিসেবে জানে, অন্যদিকে প্রভাবশালী পরিবার তাই কেউই তার কথা বিশ্বাস করলো না। তাকে গ্রাম থেকে বের করে দেয়া হলো। আমরাও শুধুই চোখের জল ফেলা ছাড়া কিছুই করতে পারি নি।

মাস খানেক পর একটা চিঠি এলো। লেখাটা জামালের নয় কিন্তু নামটা লিখেছে সে নিজেই। ‘টাকাটা আমি চুরি করি নি। যেদিন আমাকে গ্রাম থেকে বের করে দেয়া হলো তার আগের রাতের সন্ধ্যার বেশ কিছু পরে রব্বানী ( ছদ্মনাম) তার দলবল নিয়ে আমাদের সড়কে পাশের গ্রামের জাকি কাকার ( ছদ্মনাম) কাছ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা কেড়ে নেয়। সাথে হুমকিও দেয়, প্রকাশ করলে মেরে ফেলা হবে। পুরো ঘটনাটি আমি কাছের একটা গাছের আড়াল থেকে দেখে ফেলি। সেই রাতেই আমি টাকাটা রব্বানীর ঘর থেকে সরিয়ে জাকির  কাকাকে দিয়ে আসি। কাকার কাছ থেকে জানতে পারি, দুটো বান্ডিল মিলে পঞ্চাশ হাজার টাকা ছিলো। এটাই ঘটনা। সেদিন আমি কিছু বলি নি। কারন, ওদের বাগানের ফল খেয়েছি আমি অনেকদিন, ভাত-তরকারিও খেয়েছি-তাই ওই অপবাদ মাথায় নিয়েই বের হয়ে এলাম। তোরাও ঘটনাটি প্রকাশ করবি না। এটা আমার অনুরোধ’-ইতি, জামাল।

কোথায় আছে, কেমন আছে-এই লাইনটি খুঁজছিলাম; পাই নি, আজও পাই নি। চিঠিটা শেষ করার পর আমরা দুজন বেশ খানিকক্ষণ নির্বাক ছিলাম। শুধুই অপ্রতিরোধ্য চোখের জল তীর ভাঙা নদীর জলের ন্যায় সর্বাঙ্গ ভাসিয়ে ভেতরটা শুন্যতা আর হাহাকারে পরিপূর্ণ করে তুললো।

রাব্বানী ওই প্রভাবশালী পরিবারের একমাত্র সন্তান। আমরাও ঘটনাটি প্রকাশ করি নি। সেইদিনের কথা যখনই মনে আসে তখনই কেঁদে উঠি-কষ্টে, আর ছিন্ন-ভিন্ন হই এই অপরাধে, আমরা একবারের জন্যও বলতে পারি নি জামাল চোর নয়। আজ অনেক বছর কেটে গেলো, আমরা খুঁজে বেড়াই জামালকে। খুঁজবো, যতোক্ষণ এ দেহে প্রাণ আছে।

 

 






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*