Main Menu

তামাক থেকে মুক্তি পেতে ব্যাংক কর্মকর্তার করুণ আত্মকাহিনী

আবদুল করিম বিটু, চকরিয়াঃ

আমার মেঝ ছেলে সাফওয়ান। কি ফুটফুটে, কিউট আর মোটাসোটা। দেখলেই মন ভরে যেতে। মনে হত সারাদিন আদর করি।
২০১২ সাল ছেলেটির বয়স ৬ মাসের মত। হঠাৎ জনতা ব্যাংকের ম্যানেজার হিসেবে চকরিয়া শাখায় বদলীর আদেশ হল। ভাবলাম, পরিবার সহ গ্রামে থাকি। দীর্ঘ দিন বাড়ির বাইরে ছিলাম। তাই মনে কোণে কোথাও গ্রামের প্রতি টানটা সবসময় ছিল। জানুয়ারির প্রথম দিকে চলে এলাম গ্রামের বাড়ি। মাস দুয়েক আনন্দেই কাটল। প্রসংগত বাড়ির একটু বিবরণ দেওয়া দরকার। তাহলে পাঠকদের বুঝতে সুবিধা হবে।
আমাদের বাড়িটি ছিল সেমিপাকা দক্ষিণ মূখী। পশ্চিম দিকে খোলামেলা হলেও পূর্ব দিক ছিল আবদ্ধ। কারণ পূর্ব দিকে আমাদের দেয়ালের সাথে জ্যাঠাদের বাড়ি লাগানো। তাই পূর্ব দিকের আলো বাতাস থেকে আমরা বঞ্চিত ছিলাম। পূর্ব দিকে আমাদের কোন জানালা ছিলনা।
দীর্ঘ দিন পর বাড়ি এসে দেখলাম পশ্চিম দিকে আমাদের বাড়ি থেকে কয়েক হাত দূরে চার-পাঁচটি তামাক চুল্লী। অধিকন্তু চুল্লী গুলোর বিষাক্ত ধোয়া নির্গমন পথ আমাদের বাড়ির দিকে মুখ করা। প্রথম দুয়েক মাস এটা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাইনি। যখন তামাক পোড়া শুরু হল তখন মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। চুল্লীর বিষাক্ত ধোয়া, অসহনীয় উৎকট গন্ধ একেবারে স্বাভাবিক জীবন বিষিয়ে তুলল। যতক্ষণ অফিসে থাকতাম মনে হত স্বর্গে আছি। কিন্তু পরিবার কি অফিসে নেয়ার সুযোগ আছ! বাধ্য হয়ে আমার স্ত্রী ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে দিনের বেলা কাছেই তার দাদার বাড়িতে চলে যেত। দিন কোন মতে চলে গেলেও রাত আসত ভয়াল রুপে যা ছিল অসহনীয়।
ব্যাংকের চাকরি। সারাদিন প্রচন্ড পরিশ্রম করে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরতাম। আমি এলে আমার স্ত্রী ও ছেলেদের নিয়ে বাড়ি আসত। বড় ছেলে রাফসান। তখন তার বয়সও খুব বেশি নয়। সবে ছয় বছরে পা দিয়েছে। ছোট ছোট দুই সন্তানকে প্রচন্ড দুশ্চিন্তা হত। আমরা যেখানে তামাকের এই বিষাক্ত ধোয়ায় কাবু, সেখানে তারা কিভাবে বাচঁবে!!
চুল্লী গুলো আমাদের বাড়ির এত কাছে ছিল যে মনে হত নিশ্বাস নিচ্ছি ঐ জলন্ত চুল্লীর বিষাক্ত ধোয়া থেকে। (এখনও আছে, শুধু আমরা নেই। তবে বয়স্ক মা আছে। আছে ছোট ভাই,তার স্ত্রী এবং ৩ মাসে ফুটফুটে মেয়ে। কামনা করি ছোট্ট শিশুটির পরিণতি যেন সাফওয়ানের মত না হয়)। পূর্ব দিক বদ্ধ থাকায় উৎকট, বিষাক্ত ধোয়াগুলো বের হতে পারত না। রুমের দরজা বন্ধ করে কি ধোয়া আসা আটকানো যায়। নির্গমনের পথ না থাকায় সারারাত গুমট ধোয়ার ভেতর ঘুমাতে হত। কোন উপায় যে নাই। বাচ্ছারা পড়লেই ঘুমিয়ে পড়ে। আমাদের কি আর ঘুম আসে। নিজের চিন্তা বাদ দিয়ে বাচ্ছাদের চিন্তায় অস্হির থাকতাম আর ভাবতাম এই বিষাক্ত ধোয়া বাচ্ছাদের ভেতরে ভেতরে কি ক্ষতিটাই না করছে।
সারাদিনের পরিশ্রম শেষে বিষাক্ত ধোয়ায় নিশ্বাস নিয়েও যে ঘুমাব তার উপায় নেই। রাত ১০/১১ টার দিকে যেই ঘুমাতে যাব অমনি হাই ভলিউমে উদ্ভট গান শুরু। পাশাপাশি ছেনি আর হাতুড়ি দিয়ে কাঠ কাটার বিকট শব্দ সমানে চলে গভীর রাত অবধি। মনে হত মাথায় কেউ হাতুড়ি পেটা করছে। প্রতি রাতের এই যন্ত্রণা যখন সহ্যের বাইরে চলে গেল এক রাতে খুব গালাগালি করলাম।যথারীতি মালিক হাজির। তিনি আবার ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। বললেন তাহার রুজি এটা।এটা বন্ধ হলে তিনি অকুল পাথারে পড়বেন। বললাম আপনার রুজির জন্য প্রতিবেশীকে এভাবে কষ্ট দিতে পারেননা। আশ্বাস দিলেন গভীর রাত অবধি কাঠ না কেটে দিনে কাটবেন। যাক অন্তত একটা সমস্যা থেকে মুক্তি পেলাম।
এদিকে আমাদের আশংকা সত্যি প্রমাণ করে ৬ মাসের সাফওয়ান অসুস্থতা হয়ে পড়ল। ডাক্তার দেখালাম। বলল শ্বাস জনিত সমস্যা। এন্টিবায়োটিক সহ ঔষধ দিলেন। খেয়ে কয়েক দিন পর একটু ভাল হল। ভাল থাকাটা মাত্র কয়েকদিন স্হায়ী হল। আবার শুরু হল শ্বাস কষ্ট। আমার এতটুকু আদরের ছেলে কি কষ্টটাই না পাচ্ছে। দিনে কিছুটা ভাল থাকলেও রাত বাড়ার সাথে সাথে তার শ্বাস কষ্ঠ পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকত। তার কষ্ঠে কত রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি তার কি হিসেব আছে।এমন কোন সপ্তাহ নেই তাকে ডাক্তার দেখাতে হয়নি। পরিবেশই যেখানে বিষাক্ত সেখানে ঔষুধে আর কিবা কাজ করবে। কতবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে!
শেষ পর্যন্ত ১/২ মাস পর তামাক পোড়ার মৌসুম শেষ হল। যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। নির্মল বাতাস কি মধুর তা নতুন ভাবে বুঝলাম। কিন্তু এ যেন শেষ হইয়াও হইলনা শেষ অবস্হা। দুঃখের কাল যে এত দীর্ঘ হবে তা কি জানতাম? ছেলের অসুখ আর কোনমতেই ভাল হয় না। চট্টগ্রামের যত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আছেন কাউকে বাদ রাখলাম না। সবার একই কথা এটি এত সহজে ভাল হবে না। কত উপদেশ, ধুলায় যাওয়া যাবে না, দৌড়ানো যাবে না, ঠান্ডা লাগানো যাবে না, বেশী খেলা করা যাবে না!! আরও কত?? ছেলের শৈশব আর কিবা থাকল? বাসায় তার জন্য নেবুলাইজার মেশিন, চেম্বার, ড্রপ, ঔষুধের স্তুপ। ছোট খাট ফার্মেসী। খরচে কথা নিশ্চয় অনুমান করতে পারছেন!! পরবর্তী তামাক মৌসুম শুরু হওয়ার আগে আমরা শহরে চলে যাই।

সেই ৬ মাসের সাফওয়ানের বয়স এখন ৯ বছর। কিন্তু তামাকের বিষাক্ততা করাল গ্রাস এখনও তার পিছু ছাড়েনি। এত চিকিৎসার পরও তার শ্বাস কষ্ঠ এখনও বিদ্যমান। যথারীতি ডাক্তার ঔষুধ আছে। আরও কতদিন ভোগতে হবে শুধু আল্লাহই জানে।

প্রত্যেকের জীবন আছে। আপনি নিজের জীবনের স্বার্থে আরেকজনকে ধংস করতে পারেন না। আপনাকে প্রতিবেশীর সুবিধা অসুবিধার প্রতি সজাগ থাকতে হবে। সমাজ এবং এলাকার প্রতি আপনার দায়বদ্ধতা থাকতে হবে।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*