Main Menu

অবৈধ খননে আমাজন জঙ্গলের ক্ষতি

২০১৯ সালের জুলাইয়ে পাওয়া স্যাটেলাইটের ছবিতে আমাজনের জায়গায় অবৈধ খননকাজ বৃদ্ধির চিহ্ন পাওয়া যায়
 
বিবিসিএকাত্তর ডেস্ক : আমাজন জঙ্গলে অবৈধভাবে খনন কাজ করার জন্য এত ব্যাপক আকারে ক্ষতি হয়েছে যে তা মহাকাশ থেকেও দেখা যায়। আমাজন জঙ্গলের ব্রাজিলের সীমানার ভেতরে থাকা অংশে কিছু এলাকায় স্থানীয় নৃতাত্বিক গোষ্ঠীর মালিকানাধীন জমিতে অবৈধ কার্যক্রম বিপদজনক হারে বেড়েছে বলে উঠে এসেছে বিবিসি নিউজ ব্রাজিলের প্রকাশ করা সাম্প্রতিক এক ভিডিওতে।
 
ব্রাজিল বাদেও দক্ষিণ অ্যামেরিকার সাতটি দেশে ছড়িয়ে রয়েছে আমাজন জঙ্গল। পরিবেশবিদ এবং নৃতাত্বিক গোষ্ঠীর নেতারা মনে করেন, পারা ও রোরাইমা রাজ্যে ব্যাপক হারে বন উজাড় হওয়ার কারন সেসব জায়গায় অবৈধ খননের বিষয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেয়ার বোলসোনারোর সমর্থন।
 
পরিসংখ্যানের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন
 
নৃতাত্বিক গোষ্ঠীদের জায়গায় খনন কাজকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ব্রাজিলে বিদ্যমান আইনের বিপরীত একটি আইন প্রণয়নে সমর্থন করেন মি. বোলসোনারো। পাশাপাশি, বিশ্বের সর্ববৃহৎ রেইনফরেস্টের যথাযথ সংরক্ষণ করা হচ্ছে না – এমন সমালোচনার বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
 
ব্রাজিলের রাষ্ট্রীয় একটি সংস্থা, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্পেস রিসার্চ, একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে আমাজনে বন উজাড় করার হার বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। ঐ প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য উপাত্তকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট।
 
“যদি আসলেই এত ব্যাপক হারে বন উজাড় করা হতো, তাহলে পুরো জঙ্গলটাই এতদিনে ধ্বংস হয়ে যেত”, গতসপ্তাহে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে এমন বক্তব্য দিয়েছেন মি. বোলসোনারো। বন উজাড় করা বিষয়ে একটি সরকারি সংস্থার প্রকাশিত তথ্যকে জনসম্মুখে চ্যালেঞ্জ করেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট মি. বোলসোনারো (ডানে)
 
 
মহাকাশ থেকে যা দেখা যায়
 
বিবিসি নিউজ ব্রাজিল মার্কিন সংস্থা প্ল্যানেট ল্যাবের কাছ থেকে পাওয়া কিছু ছবি যাচাই করে বন উজাড় করার বিষয়টি প্রকাশ করে। প্ল্যানেট ল্যাবের মহাকাশে একশোটিরও বেশি স্যাটেলাইট আছে যেগুলো থেকে প্রতিদিন ভূ-পৃষ্ঠের ছবি পাওয়া যায়।
 
নৃতাত্বিক গোষ্ঠীদের জন্য সংরক্ষিত তিনটি এলাকায় – যেসব এলাকায় স্বর্ণ পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে ধারণা করা হয় – অবৈধ খনন কার্যক্রমের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঐ তিনটি সংরক্ষিত অঞ্চল প্রায় ২ লক্ষ ৪৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত; অর্থাৎ আয়তনে যুক্তরাজ্যের চেয়েও বড় একটি অঞ্চল।
 
ঐ এলাকাগুলো ব্রাজিলের সীমানার মধ্যে থাকা আমাজন জঙ্গলের সবচেয়ে সংরক্ষিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে পড়ে। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে – খনির শ্রমিকরা রয়েছে, এমন জায়গার সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। এগুলোর মধ্যে কিছু কিছু জায়গায় দশ বছরের বেশি সময় ধরে অবৈধ খননকাজ চলছে।
 
স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবির দুইজন বিশেষজ্ঞ – ভূতাত্বিক কার্লোস সউজা এবং ভূগোলবিদ মার্কোস রোসা – নিশ্চিত করেছেন যে খননকাজের হার বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি ছবি পর্যালোচনা করে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
 
এবিষয়ে কথা বলার জন্য ব্রাজিলের পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং কেন্দ্রীয় পুলিশের পাশাপাশি নৃতাত্বিক গোষ্ঠীগুলোর সুরক্ষার জন্য নিয়োজিত সংস্থা ‘ফুনাই’এর সাথেও যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে বিবিসি, তবে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রোরাইমা’র ‘সোনালী বিস্ময়’
 
রোরাইমা রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য স্বর্ণ। তবে রাজ্যটিতে কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত একটি বৈধ খনিও নেই। এই স্বর্ণ ইয়ানোমামিদের জন্য সংরক্ষিত অঞ্চল থেকে আসছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে একটি তদন্ত চলছে।
 
রোরাইমা রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য স্বর্ণ হলেও রাজ্যটিতে কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত একটি বৈধ খনিও নেই। নৃতাত্বিক গোষ্ঠীর নেতাদের মতে, অন্তত ১০ হাজার শ্রমিক সেখানে অবৈধভাবে খননকাজ চালাচ্ছে। ১৯৯২ সালে ইয়ানোমামি গোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঐ অঞ্চলের কর্তৃত্ব দেয়া হয়। ঐ অঞ্চলের জায়গার ওপরে তাদের অধিকারের বিষয়টি ব্রাজিলের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে।
 
জানুয়ারি মাসে মি. বোলসোনারো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে আমাজনের অনেক জায়গাতেই ‘অনধিকার প্রবেশকারীদের যাতায়াত উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে’ বলে দাবি করেন নৃতাত্বিক গোষ্ঠীদের অধিকারের বিষয় নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনের মুখপাত্র সোনিয়া গুজারাজা।
 
মি. বোলসোনারো সাংসদ থাকাকালীন সময় থেকেই কিন্তু খননকাজ চালানোর পক্ষপাতী ছিলেন। তার যুক্তি, এই ধরণের কার্যক্রম নৃতাত্বিক গোষ্ঠীর মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাবে। এপ্রিলে রোরাইমার নৃতাত্বিক গোষ্ঠীর যেসব নেতা খননকাজের পক্ষপাতী, তাদের সাথে দেখা করে মি. বোলসোনারো বলেন, “সমৃদ্ধ ভূমিতে দরিদ্র হয়ে জীবনযাপন করার সুযোগ নেই নৃতাত্বিক গোষ্ঠীগুলোর।”
 
১৯৮৮ সালে ব্রাজিলের সংবিধান নৃতাত্বিক গোষ্ঠীদের জায়গায় খনিজ পদার্থ নিষ্কাশন কার্যক্রম বৈধ করলেও নির্দিষ্ট কিছু আইনি বাধা জুড়ে দেয় তার সাথে। এখন পর্যন্ত কোনো কংগ্রেসই ঐ আইনগুলো অনুমোদন করেনি বিধায় সেসব এলাকায় খননকাজ এখনও অবৈধই রয়ে গেছে।
 
সোনিয়া গুজারাজা’র মতে, নেতিবাচক সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব পড়ার চিন্তা থেকে অধিকাংশ নৃতাত্বিক গোষ্ঠীই খননকাজ করতে চায় না। ল্যাটিন আমেরিকার পরিবেশ নিয়ে কাজ করা এনজিও’দের একটি সংস্থার ২০১৮ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী ব্রাজিলে নৃতাত্বিক গোষ্ঠীদের জন্য সংরক্ষিত এলাকার অন্তত ১৮টিতে অবৈধ খননকাজ হয়।
 
খননকাজ জঙ্গলে ক্ষতচিহ্ন তৈরি করে
 
আমাজনে খনির কাজ মূলত দুই ভাবে হয়ে থাকে: ভেলায় করে নদীর পৃষ্ঠের মাটি চালুনির মাধ্যমে যাচাই করে দামী ধাতুর খোঁজ করে, অথবা মাটি খননের মাধ্যমে। দ্বিতীয় পদ্ধতিটি সাধারণত বড় পরিসরেই করা হয়ে থাকে। খননকারীরা জঙ্গলে গর্ত খুঁড়ে ‘ক্ষতচিহ্ন’ তৈরি করে যা মহাকাশ থেকেও দেখা যায়।
 
গাছ কাটার পাশাপাশি এই ধরণের খননকাজও নদীর স্রোত ও গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে। খননকাজের ফলে তৈরি হওয়া কৃত্রিম জলাধার মশার বংশবৃদ্ধির জায়গায় পরিণত হয়। কাজেই অ্যামাজনের ঐসব অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার ব্যাপকতার কারণ সহজেই অনুমান করা যায়।
 
এছাড়াও খননকাজে ব্যবহৃত পারদ নদীর মাছসহ পুরো খাদ্যচক্রকেই প্রভাবিত করে। পারদের বিষক্রিয়ায় মানুষের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং মারাত্মক বিকলঙ্গতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ২০১৬ সালে ব্রাজিলের শীর্ষস্থানীয় একটি জনস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি ইয়ানোমামি গ্রামের ৯২% মানুষই পারদের বিষক্রিয়ার শিকার। এছাড়া নৃতাত্বিক গোষ্ঠীদের এলাকায় খননকাজ বৃদ্ধি পাওয়াই সহিংসতা এবং অপরাধ প্রবণতার বৃদ্ধির কারণ বলে মনে করা হয়।
 
ব্রাজিলে নৃতাত্বিক গোষ্ঠীদের জায়গায় সব ধরণের খননকাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ অর্থায়ন হ্রাস। আমাজন সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে গবেষণা করা ব্রাজিলভিত্তিক একটি সংস্থা ইমাজনের গবেষক পাওলো বারেতো মনে করেন প্রেসিডেন্ট বোলসোনারোর মন্তব্য আর আইনের দুর্বল প্রয়োগ থাকার কারণে অবৈধ খননের বিস্তৃতি বাড়ছে।
 
বিবিসিকে তিনি বলেন, “মানুষ মনে করে তারা বন উজাড় করার জন্য শাস্তির সম্মুখীন হবে না, তাই এধরণের কাজ করার মানসিকতা তৈরি হয়েছে মানুষের মধ্যে।” এবছরের শুরুতে ব্রাজিলের পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রী রিকার্ডো সালেস সেদেশের প্রধান পরিবেশবাদী সংস্থা ইবামা’র জন্য বরাদ্দ অর্থ ২৫% কমানোর নির্দেশ দিয়েছিল।
বন উজাড় করার প্রবণতা
 
জুলাইয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্চ জানায় যে ২০১৮ সালের তুলনায় এবছরের জুন মাসে আমাজনে বন উজাড় করার হার বেড়েছে ৮৮%। সংস্থাটির একজন মুখপাত্র খননকাজকেই এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।





Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*